মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৮ অপরাহ্ন

‘ক্লিন সিটি–গ্রিন সিটি’ গড়তে চার হাজার কোটি টাকা বাজেট, বাস্তবায়নের হিসাবেই বড় প্রশ্ন

রিপোর্টারের নাম :
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ১৪ বার পঠিত

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৪ হাজার ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ছিল ৩ হাজার ১৩৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকার। সে হিসাবে এবার বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ৮৬৬ কোটি টাকা। তবে বাজেট বড় হলেই পুরো অর্থ খরচ হবে, আগের কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা তা বলছে না। এবারের বাজেটে আগের অর্থবছর থেকে অব্যয়িত ৭৩০ কোটি ৯৩ লাখ টাকাও যোগ করা হয়েছে, অর্থাৎ এই টাকা চলতি বছরে নতুন করে আয় হবে না। আবার অর্থবছর শেষে ৫৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকা অব্যয়িত থাকবে বলে ধরা হয়েছে। ফলে ঘোষিত ৪ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই নাগরিক সেবা ও উন্নয়নকাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা নেই। ২৬ জুলাই ডিএসসিসির পরিচালনা কমিটির সভায় বাজেটটি অনুমোদন করা হয়। বৃহস্পতিবার নগর ভবনে বাজেট ঘোষণা করেন সংস্থাটির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি বলেছেন, উচ্চাভিলাষী বড় অঙ্কের বাজেট না করে বাস্তবায়নযোগ্য ও যৌক্তিক বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। নগরবাসীর ওপর নতুন কর আরোপ বা করের হার না বাড়িয়ে নতুন আয়ের খাত সৃষ্টি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর কথা বলেছেন তিনি।.ডিএসসিসির আগের বাজেটগুলোর সঙ্গে প্রকৃত হিসাবের বড় ব্যবধান রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৬ হাজার ৭৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকার। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের প্রকৃত হিসাব দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৯৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ঘোষিত বাজেটের মাত্র ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ। পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৬ হাজার ৭৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার। বাজেট বাস্তবায়নের প্রকৃত হিসাব ছিল ২ হাজার ৫৪২ কোটি ৩ লাখ টাকা বা ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ।২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট আরও বাড়িয়ে ৬ হাজার ৭৬০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা করা হয়েছিল। চলতি বাজেট বইয়ে ওই অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের প্রকৃত হিসাব দেখানো হয়েছে ২ হাজার ১৫৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, অর্থাৎ বাস্তবায়ন হয়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ। তিন অর্থবছরের হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, ঘোষিত বাজেটের বিপরীতে বাজেট বাস্তবায়নের প্রকৃত হিসাব গড়ে ৩৩ শতাংশে আটকে ছিল।গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অবশ্য বাজেটের আকার কমিয়ে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা করা হয়। পরে সংশোধিত বাজেট আরও কমিয়ে ৩ হাজার ১৩৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় নামানো হয়েছে। এক বছরের মধ্যেই বাদ গেছে ৭০২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সেই সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এবার প্রায় ৮৬৬ কোটি টাকা বেশি ধরা হয়েছে। অতীতের বাস্তবায়ন বিবেচনায় এই বাড়তি অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।.পরিচ্ছন্নতা খাতে বরাদ্দ গত অর্থবছরের সংশোধিত ৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। বৃদ্ধি চার গুণের বেশি। তবে পুরো অর্থ নতুন বর্জ্যবাহী গাড়ি, যন্ত্রপাতি কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামোয় ব্যয় হবে না।এই খাতের ১৮০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরির জন্য। নর্দমা ও নিকাশিকাঠামো পরিষ্কারে ৫৫ কোটি, জ্বালানিতে ১৯ কোটি এবং ব্যবস্থাপনায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। মূলধন ব্যয় ৩৮ কোটি টাকা, অর্থাৎ বরাদ্দ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ শ্রমিকের মজুরি। তাই পরিচ্ছন্নতার বরাদ্দ চার গুণ হওয়া মানেই পরিচ্ছন্নতার সক্ষমতা চার গুণ বেড়ে যাওয়া নয়।প্রশাসক তাঁর বক্তব্যে ‘ক্লিন সিটি–গ্রিন সিটি’ বাস্তবায়নে পরিচ্ছন্নতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে কতজন শ্রমিক কোথায় কাজ করবেন, দৈনিক কত বর্জ্য অপসারণ হবে এবং কোন সূচকে কাজের ফল মূল্যায়ন করা হবে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ না করলে বড় বরাদ্দের সুফল যাচাই করা কঠিন হবে।.স্বাস্থ্য খাতে গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এবার তা বাড়িয়ে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা করা হয়েছে। তবে এই বরাদ্দের ৫৫ কোটি টাকা অনিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি এবং ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা মশা নিধনের কীটনাশকের জন্য। দুটি খাতেই চলে যাবে প্রায় ১০৬ কোটি টাকা বা স্বাস্থ্য বরাদ্দের প্রায় ৮৭ শতাংশ।ওষুধ ও প্রতিষেধকে রাখা হয়েছে ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা ও মর্গের জন্য আলাদা বরাদ্দ মাত্র ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ফলে ‘স্বাস্থ্য খাতে ১২২ কোটি টাকা’ শুনে হাসপাতাল বা সাধারণ চিকিৎসাসেবায় বড় সম্প্রসারণ হচ্ছে বলে মনে করার সুযোগ নেই। এটি মূলত মশক নিয়ন্ত্রণের বাজেট।অবশ্য মশার জন্য বড় বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রশাসক জানান, চার বছরের এডিস মশার লার্ভা জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতে নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া গেছে। তবে কীটনাশক কেনার পাশাপাশি এর কার্যকারিতা, প্রয়োগের এলাকা ও ফলাফলও প্রকাশ করা প্রয়োজন।.বাজেটের রাজস্ব প্রাপ্তির মধ্যে ৪০০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে ‘দায় বৃদ্ধি’ হিসেবে। এর মধ্যে ২০০ কোটি টাকা সাসপেন্স হিসাবে জমা এবং ২০০ কোটি টাকা ঠিকাদারদের নিরাপত্তা জামানত থেকে আসবে বলে ধরা হয়েছে। এগুলো কর, ফি বা সেবা থেকে অর্জিত নিয়মিত আয় নয়। ফলে ১ হাজার ৮১৫ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের পুরোটা ডিএসসিসির নিজস্ব আয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।সড়ক খনন ফি থেকে ২০০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যও বেশ বড়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতের প্রকৃত আয় ছিল মাত্র ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ঢাকা ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৪১৫ কিলোমিটার সড়ক খোঁড়ার সম্ভাবনা সামনে রেখে এই আয় ধরা হয়েছে, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রাটি নিয়মিত রাজস্বের বদলে একটি বিশেষ প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল।.সরকারি ও বৈদেশিক সহায়তানির্ভর উন্নয়ন আয়ের লক্ষ্য ১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব উৎস থেকে প্রকৃত প্রাপ্তি ছিল প্রায় ৫৩৬ কোটি টাকা। এবার লক্ষ্যমাত্রা তার প্রায় তিন গুণ। একইভাবে উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্য ১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত উন্নয়ন ব্যয় ছিল ৮১৪ কোটি টাকার মতো। সহায়তা বা প্রকল্পের অর্থ সময়মতো না এলে বাজেট আবারও বড় সংশোধনের মুখে পড়তে পারে।প্রশাসক ওয়ার্ডভিত্তিক গণশুনানি, জবাবদিহি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর যে কথা বলেছেন, তা ইতিবাচক। তবে পুরোনো পরিস্থিতি বদলাতে হলে তিন মাস পরপর আয়-ব্যয়ের অগ্রগতি প্রকাশ, প্রকল্পভিত্তিক অর্থ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য খাতে পরিমাপযোগ্য ফলাফল জানাতে হবে। তা না হলে চার হাজার কোটি টাকার বাজেটও আগের বাজেটগুলোর মতো বড় ঘোষণা ও ছোট বাস্তবায়নের আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।.বাজেট বক্তৃতায় ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, উচ্চাভিলাষী ও বড় অঙ্কের বাজেট না করে বাস্তবায়নযোগ্য ও যৌক্তিক বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। নগরবাসীর ওপর নতুন করে কর আরোপ বা করের হার বাড়ানো হয়নি। করপোরেশনের নিজস্ব আয় বাড়াতে নতুন রাজস্ব খাত সৃষ্টি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।প্রশাসকের ভাষ্য, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, ডেঙ্গু ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর বিষয়গুলোকে বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্লিন সিটি–গ্রিন সিটি বাস্তবায়নের একটি ধাপ হিসেবেই এবারের বাজেট তৈরি করা হয়েছে।নগরবাসীর উদ্দেশে মো. আবদুস সালাম বলেন, এই বাজেট শুধু আয়–ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি করদাতাদের আস্থা ও করপোরেশনের ওপর অর্পিত দায়িত্বের প্রতিফলন। বাজেটের প্রতিটি টাকা জনগণের কল্যাণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করার অঙ্গীকার করেন তিনি।

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/capital/vpxg1rrq84

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর বিস্তারিত....

আজকের দিন-তারিখ

  • মঙ্গলবার (রাত ৮:৫৮)
  • ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৯শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
  • ১৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল)