মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৫ অপরাহ্ন

চা–শ্রমিকেরা এক ক্লিকেই টাকা পাচ্ছেন, বেতনে নতুন ব্যবস্থাপনা

রিপোর্টারের নাম :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার পঠিত

পঞ্চগড়ের বিস্তীর্ণ চা–বাগানে প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবন। চা-পাতা সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাগানের নানা কাজে তাঁদের শ্রমেই এগিয়ে চলে পুরো ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘদিন ধরে এসব শ্রমিকের বেতন পরিশোধের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ক্যাশ টাকা, অপেক্ষা এবং নির্দিষ্ট সময়ে টাকা হাতে পাওয়ার প্রক্রিয়া। তবে সেই চিত্রে এখন এসেছে পরিবর্তন। দেশের সর্ব–উত্তরে অবস্থিত কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের শ্রমিকেরা এখন তাঁদের বেতন পাচ্ছেন বিকাশের ডিজিটাল ওয়ালেটে। প্রথমবারের মতো দেশে কোনো চা–বাগানের শ্রমিকদের ডিজিটাল ওয়ালেটে বেতন দেওয়ার এই উদ্যোগ শুধু অর্থ পরিশোধের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনেনি; বরং তাঁদের দৈনন্দিন আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও তৈরি করছে নতুন অভ্যাস।.আগে বেতন পাওয়ার জন্য শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে হতো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ক্যাশ টাকা হাতে পৌঁছানোর এই প্রক্রিয়ায় সময়ের পাশাপাশি যুক্ত ছিল অর্থ বহনের ঝুঁকি ও নানা ধরনের ভোগান্তি। এখন নির্ধারিত সময়ে বেতন সরাসরি ডিজিটাল ওয়ালেটে পৌঁছে যাওয়ায় সেই অপেক্ষার প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে।বিকাশে বেতন পাওয়ার সুবিধার প্রসঙ্গে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের চা–শ্রমিক মাজেদুর রহমান বলেন, ‘এটা যদি আরও আগে হতো, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হতো। এখন যেভাবে বেতনের টাকা পাচ্ছি, এতে আমাদের অনেক সুবিধা হয়েছে। আমার যতটুকু টাকা প্রয়োজন, ততটুকুই খরচ করছি। আর বাকি টাকা পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দিতে পারছি।’তবে পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বেতন পাওয়ার সুবিধাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ডিজিটাল ওয়ালেটে অর্থ পাওয়ার ফলে শ্রমিকদের সামনে তৈরি হচ্ছে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা ব্যবহারের আরও সহজ সুযোগ। একই সঙ্গে তাঁরা ধীরে ধীরে পরিচিত হচ্ছেন ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে, যা তাঁদের দৈনন্দিন আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে নতুন অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।.আগের বেতন গ্রহণের প্রক্রিয়া আর বর্তমান ব্যবস্থার পার্থক্য তুলে ধরে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের আরেক শ্রমিক বানু আক্তার বলেন, ‘এখন মোবাইলেই বেতনের টাকা চলে আসছে। যখন প্রয়োজন হচ্ছে, তখনই টাকা তুলে নিতে পারছি। আগে বেতন তুলতে অফিসে যেতে হতো, অনেক সময় সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এখন মোবাইলেই টাকা পেয়ে যাচ্ছি, তাই আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হয়েছে।’এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে বাগান কর্তৃপক্ষের কাজের ধরনেও। আগে তাদের ৯টি ডিভিশনে আলাদাভাবে শ্রমিকদের হাতে বেতন পৌঁছে দিতে হতো। পঞ্চগড় শহর থেকে ক্যাশ টাকা এনে তা বিতরণ করা ছিল সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। এখন একই ব্যবস্থাপনার আওতায় একসঙ্গে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।ক্যাশের পরিবর্তে বিকাশে বেতন দেওয়ার ফলে নিরাপত্তা–সুবিধার পাশাপাশি সময়ও সাশ্রয় হয়েছে। এ বিষয়ে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের ম্যানেজার মুন্সি মো. আল ইমরান হোসেন বলেন, ‘নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে প্রথম অগ্রাধিকার ছিল। আগে যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টি ছিল, সেটি এখন সমাধান হয়েছে। পাশাপাশি আমরা খুব সহজেই এবং নির্বিঘ্নে বেতন দিতে পারছি। এক ক্লিকেই একই সময়ে সবার কাছে বেতনের টাকা চলে যাচ্ছে।’.মুন্সি মো. আল ইমরান হোসেন আরও বলেন, ‘আমাদের অনেক স্টাফ ও শ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের যদি একজন একজন করে টাকা দিতে যেতাম, তাহলে দেখা যেত তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এখন আমরা সেই সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি।’বিকাশের পে-রোল সলিউশনের মাধ্যমে পুরো বেতন ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল হওয়ায় অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় এসেছে নতুন গতি। শ্রমিকদের জন্য এটি যেমন বেতন পাওয়ার একটি সহজ মাধ্যম, তেমনি বাগান কর্তৃপক্ষের জন্যও বেতন ব্যবস্থাপনাকে আরও গোছানো করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বেতন পরিশোধে নতুন এই ব্যবস্থার সুবিধা ব্যাখ্যা করে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের অপারেশনস ম্যানেজার প্রদীপ কুমার ভার্মা বলেন, ‘আমাদের ৯টি ডিভিশনে প্রায় ৪৪৫ হেক্টর এলাকায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় ৬০০ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের বেতন এক দিনে পরিশোধ করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। এর জন্য আলাদা লোকবলও প্রয়োজন হতো। সবকিছু বিবেচনায় এখন বিকাশের মাধ্যমে বেতন পরিশোধ করায় আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়েছে।’বেতন পাওয়ার পর সেই অর্থ শুধু ক্যাশ টাকা হিসেবে হাতে তুলে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন সেবায় বিকাশ ব্যবহারের সুযোগ থাকায় শ্রমিকদের আর্থিক লেনদেনের পরিধিও বাড়ছে।.চা–শ্রমিকদের বিকাশে বেতন পাওয়ার মাধ্যমে মূলধারার আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ বলেন, চা–শ্রমিকেরা বিকাশে শুধু বেতন পাওয়ার একটি নতুন মাধ্যমই পাচ্ছেন না, বিকাশের অন্যান্য সেবাগুলোও ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। অর্থাৎ, দেশের অন্যান্য মানুষ বিকাশের যেসব সুবিধা ভোগ করছেন, চা–শ্রমিকেরাও এখন সেসব সুবিধার আওতায় আসছেন। এর ফলে তাঁরা আর্থিক সেবার মূলধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।একটি চা–বাগানের শ্রমিকের বেতন পরিশোধের পদ্ধতিতে এই পরিবর্তন তাই কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সময়ের সাশ্রয়, অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের ক্রমে যুক্ত হয়ে পড়ার গল্প।পঞ্চগড়ের চা–বাগানে শুরু হওয়া এই পরিবর্তন হয়তো একটি নির্দিষ্ট বেতনব্যবস্থার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে। তবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। ক্যাশ টাকানির্ভরতা থেকে ডিজিটাল লেনদেনে যাওয়ার এই যাত্রা শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক জীবনে তৈরি করতে পারে নতুন এক অভ্যাস ও সম্ভাবনার পথ—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/qu8le4eg44

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর বিস্তারিত....

আজকের দিন-তারিখ

  • মঙ্গলবার (বিকাল ৩:৪৫)
  • ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  • ১৯শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
  • ১৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (শরৎকাল)