
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের নবনির্বাচিত এমপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতা মুফতি আমির হামজা কুষ্টিয়ার মোহিনী মিল, সুগার মিল, রেললাইন ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দৈনিক আন্দোলনের বাজার-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়নপথও বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, মোহিনী মিল ও কুষ্টিয়া সুগার মিলসহ প্রায় ১ হাজারের বেশি বিঘা সরকারি জমি এত বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে, যা রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে বড় একটি সমন্বিত পরিকল্পনায় কাজে লাগানো হবে। এর মাধ্যমে একদিকে স্থানীয় যুবক-যুবতীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা সচল করার লক্ষ্য নিয়েই তিনি এগোতে চান। তার দাবি, জামায়াতে ইসলামী দুর্নীতিমুক্ত দল হওয়ায় উন্নয়ন বাবদ যে টাকা আসবে, তা ব্যক্তিগত পকেটে না গিয়ে পুরোটা ব্যয় হবে এলাকার উন্নয়নে।
কুষ্টিয়া শহরের মাঝখান দিয়ে চলা রেললাইনকে তিনি “বিষ পোড়ার মতো” অভিহিত করে বলেন, উন্নত নগর ব্যবস্থাপনার স্বার্থে এই রেললাইন শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া দরকার। তার প্রস্তাব, আগের পুরোনো রেলসিস্টেমের ধারাবাহিকতায় বিকল্প ট্রেস করে শহরের ভেতরের অংশ থেকে লাইন উঠিয়ে শহরের বাইরের অংশ দিয়ে নতুনভাবে সংযুক্ত করা হবে, যাতে যানজট কমে ও মানুষের চলাচল সহজ হয়। একইসঙ্গে তিনি কুষ্টিয়ার মূল সড়ককে ফোর লেনে উন্নীত করা ও বটতলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় ১৬-১৭ কিলোমিটার রাস্তা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আদলে উন্নত মানে নির্মাণের কথা বলেন।
রাস্তা নির্মাণে দুর্নীতি ও অপচয়ের প্রসঙ্গ টেনে আমির হামজা জানান, পাশের দেশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বাংলাদেশের তুলনায় সাত থেকে নয় গুণ কম খরচে রাস্তা নির্মাণ হয়, কিন্তু সেসব রাস্তা টিকে থাকে ২০-৩০ বছর। অথচ বাংলাদেশে বিপুল টাকা খরচ করে তৈরি অধিকাংশ রাস্তা দুই-তিন বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়, যা তিনি পরিকল্পিত দুর্নীতির ফল বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমরা যদি ৫০ বছর টেকার রাস্তা বানানোর কথা চিন্তা করি, তাহলে সে মান বজায় রেখে কাজ করব; নয় টাকা খরচ হলে নয় টাকারই হিসাব থাকবে, ছয় টাকা দিয়ে কাজ দেখিয়ে বাকিটা পকেটে যাবে না।”
কেউ বেকার থাকবে না—এই অঙ্গীকারকে তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। আমির হামজা বলেন, যার যে যোগ্যতা আছে, সে অনুযায়ী কাজের সুযোগ তৈরি করা হবে; প্রয়োজনে রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কাজও সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচিত হবে, কিন্তু কাউকে বসে খাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। কুষ্টিয়া-৩ আসনে তার প্রথম কাজ হবে এলাকা থেকে বেকারত্ব কমানো এবং ধাপে ধাপে এটিকে বেকারমুক্ত মডেল এলাকায় রূপ দেওয়া।
সাক্ষাৎকারে কুষ্টিয়ার পরিবেশ ও নগর পরিচ্ছন্নতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। ‘ক্লিন কুষ্টিয়া, গ্রীন কুষ্টিয়া’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ধারণা ও পরিকল্পনা অনুসারে এক মাসের মধ্যে কুষ্টিয়া শহর থেকে ভারী ধুলাবালি ও ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর দূষণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন আমির হামজা। এ জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সব প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও আইনি কাঠামো ব্যবহার করে সমন্বিত অভিযান চালানোর কথা জানান তিনি।
কৃষিনির্ভর কুষ্টিয়া অঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে আমির হামজা কুষ্টিয়ায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের কথাও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। তার ভাষ্য, সদর ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানা মিলিয়ে যে কৃষি অঞ্চল গড়ে উঠেছে, সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হলে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিন-চার হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। তিনি জানান, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখে সেখানে যে মডেল দেখেছেন, তা কুষ্টিয়ার বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করতে চান।
মোহিনী মিলের ইতিহাস ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ বস্ত্রকল হিসেবে মোহিনী মিলের অতীত ঐতিহ্য, পরবর্তী রাষ্ট্রায়ত্ত্বকরণ, লোকসান ও বারবার হাতবদলের ফলে বর্তমানে মিলটি কার্যত বন্ধ ও অব্যবহৃত; মিলের জমি বিক্রি ও হরিলুটের অভিযোগও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে একাধিকবার উঠে এসেছে। এই বাস্তবতায় মিল পুনরুজ্জীবন বা জনকল্যাণমূলক নতুন স্থাপনা নির্মাণের প্রতিশ্রুতি কুষ্টিয়াবাসীর কাছে বড় রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে দেখা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে মুফতি আমির হামজা বলেন, উন্নয়ন ও ইনসাফ—এই দুই নীতিকে সামনে রেখে তিনি কাজ করতে চান এবং কুষ্টিয়াকে এমন একটি শহরে রূপ দিতে চান, যেখানে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না, কেউ বেকার থাকবে না এবং মোহিনী মিল-কেন্দ্রিক অর্থনীতি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে।